আজ: শুক্রবার | ৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৫শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি | রাত ১০:৪৩
শিরোনাম: সোনারগাঁয়ে লন্ডন প্রবাসীর পক্ষ থেকে দুস্থদের মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণ     বন্দরে কৃষি জমির মাটি কেটে তৈরী করছে গভীর পুকুর,প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ     সোনারগাঁয়ে ইঞ্জিনিয়ার মাসুম এক অসহায়কে নগদ অর্থ প্রদান করলেন     সোনারগাঁয়ে ছিনতাইকারিদের ছুরিকাঘাতে অটোরিক্সা চালক আহত     সোনারগাঁওয়ে গ্রাম পুলিশের মাঝে সাইকেল হিজরাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ     কুষ্টিয়ায় মেছো বাঘ উদ্ধার     বন্দরে যৌতুক না পেয়ে নববধূ বিতারিত     বন্দরে জালনোটসহ জনতা কর্তৃক আটক-১     কলার থেকেও শতগুণ বেশি উপকারী খোসা!     স্বামী ও ভাসুরের নির্যাতন সইতে না পেরে বন্দরে ২ সন্তানের জননী আত্মহত্যা    
সংবাদ দেখার জন্য ধন্যবাদ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন

০৩ এপ্রিল, ২০২১ | ৪:২০ অপরাহ্ণ | bpseraj | 44038 Views

সাম্প্রতিক সময়ে চীনকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে বিভিন্ন খবর বেরিয়েছে। যেমন, পূর্ব এশিয়ার দেশটির নেতৃত্বে ১৫টি দেশকে নিয়ে গঠিত হয়েছে একটি বড় অর্থনৈতিক জোট। রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) নামের নতুন এই জোটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানের ১০ দেশের সঙ্গে চীন ছাড়াও থাকছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই মুক্ত বাণিজ্য জোট আগামী দিনের বিশ্ব বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমান বিশ্বে এ ধরনের অর্থনৈতিক জোট গঠন অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় না থাকলেও দেশটি নেই এই জোটে। যদিও ভারতের এই চুক্তিতে আসার কথা ছিল।

কিন্তু সস্তা চীনা পণ্যে বাজার ভরে যাওয়ার শঙ্কায় দেশটি গত বছর এ আলোচনা থেকে বেরিয়ে যায়। এরপরও নয়াদিল্লির জন্য দরজা খোলা রাখা হয়েছে, বলছেন আসিয়ান নেতারা। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বিদেশনীতি আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার ও নেপালের চলমান ঘটনাবলিতে চীনের ভূমিকা দেশ দুটিতে মাঠপর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি করেছে।

এর আগে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠায় গাইয়ুম বংশ এবং রাজাপক্ষে বংশকে মদদ দিয়ে এবং পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে স্থানীয় জনসাধারণের মতামত উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েও ওই তিন দেশে বহু মানুষের বিরাগভাজন হয় গণচীন।

অপরদিকে সীমান্তবিরোধ মীমাংসায় শান্তিপূর্ণ পথে না-হাঁটায় ভারতের জনগণের মধ্যেও চীনবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। এভাবে এই পুরো অঞ্চলেই চীনের নৈতিক নেতৃত্ব নাজুক অবস্থায় পড়েছে সম্প্রতি। দক্ষিণ এশিয়ায় আপাতত চীনের কূটনীতির একমাত্র সাফল্যগাথা শ্রীলঙ্কা। এখনো এখানে চীনের প্রভাবে আঁচড় পড়েনি।

তবে তাদের ঋণ-সুনামি এ দেশেও বড় এক উদ্বেগের নাম। ৪-৫ বছরের বিরতির পর রাজাপক্ষে পরিবারের ক্ষমতায় ফিরে আসা চীনের জন্য স্বস্তির হয়েছে। এটাকে তাদের ‘সফলতা’ হিসেবেও দেখা যায়। সিংহলি জাতীয়তাবাদী এই পরিবারের বড় ভাই এখন প্রধানমন্ত্রী আর ছোট ভাই প্রেসিডেন্ট।

২৬ বছর স্থায়ী তামিলবিরোধী যুদ্ধে উভয় ভাইয়ের বিরুদ্ধেই বেসামরিক জনগণকে হত্যার অভিযোগ ছিল। এই দুই ভাইয়ের একজন তখন ছিল প্রধানমন্ত্রী, অপরজন প্রতিরক্ষা সচিব। এই পরিবারের বিশেষ সুহূদ চীন। যুদ্ধকালে তামিল টাইগারদের নিশ্চিহ্ন করতে স্থানীয় সশস্ত্র বাহিনীও চীনের মদদ পায়।

২০২০ থেকে নতুন করে পুরোনো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমর্থন ফিরে পেয়ে রাজাপক্ষেরা একই সঙ্গে হিন্দু তামিল ও মুসলমান তামিল-উভয় সংখ্যালঘুদের সামাজিকভাবে কোণঠাসা করে চলেছেন বলে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ। জাতীয়তাবাদী উগ্রতায় সিংহলি সমাজের ভিন্নমতাবলম্বীরাও স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার হারাচ্ছে।

ফলে দেশটিতে এখন মানবাধিকারের প্রচণ্ড খরা চলছে। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চীনবিরোধী মেঠো জনমত তিব্বত, জিনজিয়াং, হংকং ও তাইওয়ানে চীনবিরোধী মহলকে নৈতিক শক্তি জোগাতে পারে। কিন্তু এশিয়ার এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি চীনের বিদেশনীতির গুরুতর পুনর্বিবেচনা দাবি করছে।

শ্রীলঙ্কার চলতি চীনবান্ধব সরকারের সঙ্গে নেপালের আজকের সরকার এবং মালদ্বীপ ও মিয়ানমারের বিদায়ী সরকারের বেশ মিল। রাজাপক্ষেরা সর্বশেষ নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। ২২৫ আসনের মধ্যে ১৪৫ আসন পেয়েছে তাদের দল। নেপালে ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে চীনের মদদপুষ্ট সিপিএনের আসন ১৭৪।

মালদ্বীপে এককালের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদকে হারিয়ে মোহাম্মদ ইয়ামিন সুষ্ঠু নির্বাচনেই বিজয়ী হন। মিয়ানমারে সুচির সরকার গত নির্বাচনের চেয়েও এবার বেশি আসন পেয়েছিল। দেশে-দেশে এসব সরকার ও রাজনীতিবিদদের ব্যাপক জনসমর্থন থাকার পরও নানানভাবে যে হোঁচট খায় এবং খাচ্ছে, তাতে বিদেশি সমর্থক হিসেবে চীনের বিশেষ দায় আছে বলা হচ্ছে।

চীন থেকে প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় উভয় ধরনের বিপুল অর্থনৈতিক সহযোগিতা পেয়েছে এসব সরকার। সঙ্গে বেশি করে পেয়েছে স্থানীয় মানবাধিকার পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি অসহিষ্ণুতার উত্সাহ। ফলে এ মুহূর্তে চীনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক করিডরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

বেলুচিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরে ইতোমধ্যে স্থানীয় বালুচদের ক্ষোভের আগুনের আঁচ লাগছে। ইতিহাসে কি কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়? এ নিয়ে কার্ল মার্ক্সের মজার উক্তি আছে। তার বিবেচনায় ইতিহাসে এ রকম ঘটে। তবে প্রথমে ট্র্যাজেডি আকারে; পরে প্রহসন হিসেবে।

কিন্তু মিয়ানমারে যখন এ মাসের শুরুতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে, তখন চীনের রাষ্ট্রদূত চেন হাই সেটা সম্পর্কে যে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাকে সবাই কেবল প্রহসন হিসেবে দেখেনি, মিয়ানমারের অনেকে এ ভাষ্যকে প্রতারণাও বলতে চাইছেন। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হয় তাতমাদৌ, তার আপাদমস্তক চীনপ্রভাবিত।

অস্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বুদ্ধি-পরামর্শ-সবই এই প্রভাবের পরিসরের মধ্যে আছে। তাদের বলা হয় ‘সকল মৌসুমের যুগলবন্দি। এ রকম এক বাহিনী চীনের সম্মতি ছাড়া নির্বাচিত সরকার হটিয়েছে, এমনটি মিয়ানমারে কেউ বিশ্বাস করে না। কিন্তু এই ক্যু চীনকে মিয়ানমারে চরম ঝামেলায়ও ফেলেছে।

চীন এবং তাতমাদৌ উভয়েরই অভ্যুত্থান-পরবর্তী হিসাব-নিকাশ মিলছে না। এক মাস না যেতেই ক্যুর বিরুদ্ধে মিয়ানমারজুড়ে অচিন্তনীয় এক গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এমনটি তারা আশা করেনি। একই সঙ্গে সেই আন্দোলন চীনের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশটিতে তাদের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে।

দেশটির সর্বমোট বৈদেশিক বিনিয়োগের ২৬ ভাগ চীনের। চীনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পের প্রধান এক স্তম্ভ মিয়ানমার। করিডরকে কেন্দ্র করে দেশটিতে চীনের ৩৮টি প্রকল্প আছে। এ রকম এক দেশে তরুণসমাজ চীনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করাকে আঙ্কেল শির বিদেশনীতির জন্য ট্র্যাজেডিই বলতে হবে।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে সি চিন পিং যখন মিয়ানমারে আসেন, তখন সু চির সরকারের সঙ্গে নানান বিষয়ে ৩৩টি চুক্তি হয়। কিন্তু এক বছর পেরোতেই সেই সু চি এখন বন্দি। আর এই ঘটনার খলনায়কদের পাশে চীনকে দেখা যাচ্ছে। মিয়ানমারের তরুণ-তরুণীরা এই দৃশ্য মেনে নিতে পারছেন না। তারা মানসিক সমর্থন পাচ্ছেন ওয়াশিংটন থেকে।

তাতে মাত্র তিন-চার সপ্তাহে মিয়ানমার জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভাবনীয় গণতন্ত্রপন্থি এক ভাবমূর্তি দাঁড়িয়ে গেছে। নেপালের আজকের ঘটনাবলি যেন কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া মালদ্বীপ নিয়ে চীন-ভারত টানাহেঁচড়ারই আরেক রূপ। ২০১৩ থেকে নিজেদের পছন্দের আবদুল্লাহ ইয়ামিন সরকারকে অন্ধভাবে মদদ দিয়ে সাধারণ ভোটারদের বিরক্ত করে তুলেছিল চীন।

অথচ ২০১১-র আগে দেশটিতে চীনের দূতাবাসও ছিল না। আগ্রাসী কূটনীতি আর মিলিয়ন-মিলিয়ন ঋণের পরিণতি কী হলো? ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল ইব্রাহিম সলিহ সরকারের প্রতিষ্ঠা। চীনের অর্থনৈতিক মদদে আবদুল্লাহ ইয়ামিন সরকারবিরোধী রাজনীতিবিদদের ব্যাপক দমনাভিযানে নেমে দেশটিকে অশান্ত করে তোলেন।

পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কিছু ভারতবিরোধী পদক্ষেপ নেয় ওই সরকার। ২০১৮ সালে ভারতের উপহার দেয়া একটা হেলিকপ্টার ফেরত পাঠায় তারা, নয়াদিল্লির জন্য যা ছিল বিব্রতকর। এখন সেখানে এসেছে এমন এক সরকার, ভারতের সঙ্গে যারা একের পর এক চুক্তি করছে। এমনকি কিছু প্রকল্প চীনের অতীত ঋণের অঙ্কও ছাড়িয়ে গেছে।

পাশাপাশি চীনের ঋণকে মরণফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করছেন ক্ষমতাসীন দলের মুখ্য নেতা নাশিদ। চীনের সঙ্গে চুক্তিতে দুর্নীতি করায় পুরোনো প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। মালের প্রায় কোনো দৃশ্যই আর বেইজিংয়ের জন্য সুখকর নয়।

এদিকে মিয়ানমার থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত বিশাল এই অঞ্চলে ভারতসহ প্রায় ১৮০ কোটি ভোক্তা। কেবল উদীয়মান ক্রেতা গোষ্ঠী হিসেবেই নয়, বিশাল এই জনগোষ্ঠী চীনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার দূরবর্তী রক্ষাকবচ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চীনবিরোধী মেঠো জনমত তিব্বত, জিনজিয়াং, হংকং ও তাইওয়ানে চীনবিরোধী মহলকে নৈতিক শক্তি জোগাতে পারে।

এশিয়ার এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি চীনের বিদেশনীতির গুরুতর পুনর্বিবেচনা দাবি করছে। গত দশকের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কার একটি বন্দরে চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি তাদের জন্য চরম মাথাব্যথার কারণ হয়।

পাশাপাশি, পাকিস্তানকে চীনের অব্যাহত সামরিক সাহায্য, পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরে চীনের নিয়ন্ত্রণ, কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের সড়ক নির্মাণে চীনের পরিকল্পগুনা-এসব নিয়ে ভারতে উদ্বেগের পারদ বাড়ছে।সে কারণে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন যে ২০১৪ সাল থেকে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্কে যে অনাস্থা-অবিশ্বাস বাড়ছে, তাতেই ১০ বছর বাদে আমেরিকার পক্ষে কোয়াডের পুনর্জন্ম নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু এসব দলাদলির ভেতর দিয়ে দেশগুলো এক ধরনের ‘ডেটারেন্স‘ তৈরি করতে চাইছে, মনে করছেন সৈয়দ মাহমুদ আলী, যাতে শত্রুপক্ষ তাকে ঘাঁটানোর সাহস না পায়। একে অন্যের জন্য রেডলাইন টেনে দেয়ার চেষ্টা করছে। যা মোটেও কাম্য নয়।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।





Comment Heare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »